নিউ ইয়র্ক থেকে এনা: ১/১১ পরবর্তী জরুরি সরকারের আমলে র্যাব (র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন) কর্তৃক নিউ ইয়র্কের প্রবাসী ওয়ার্ল্ডটেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাঈম চৌধুরীকে নির্যাতনের মামলায় ওয়াশিংটন ডিসির অপর প্রবাসী ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিং-এর মালিক আমজাদ হোসেন খানের পৌনে দুই মিলিয়ন ডলার তথা প্রায় ১৩ কোটি টাকা জরিমানা হয়েছে।
নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত ইউএস ফেডারেল কোর্ট এ রায় দেয় ‘টর্চার ভিকটিম প্রটেকশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী। এ আইনে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যে কোন দেশে সংঘটিত অপকর্মের বিচার করার এখতিয়ার রয়েছে ফেডারেল কোর্টের। বাংলাদেশের দুই প্রবাসীর মধ্যে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে র্যাব দিয়ে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তার এ মামলার রায়কে প্রবাসীরা স্বাগত জানিয়েছেন। আরও যারা এহেন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বা হচ্ছেন- তারাও ফেডারেল কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা যায়। মামলাটি পরিচালনা করেন নাঈম মাহতাব চৌধুরীর পক্ষে এটর্নি মার্ক এ রবার্টসন এবং বিবাদীপক্ষ আমজাদ হোসেনের পক্ষ অবলম্বন করেন এটর্নি এরিক চার্লটন।
যুক্তরাজ্যে উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণের পর নিউ ইয়র্ক প্রবাসী নাঈম মাহতাব চৌধুরী ‘ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামক একটি কোম্পানি গঠন করেন ২০০০ সালের ১২ই জুন। বিবাদী আমজাদ হোসেন খানের মালিকানাধীন ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিং ২০০১ সালে ‘ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর শেয়ারহোল্ডার হয়। ঢাকায় মাল্টি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বাংলাদেশে টেলিফোন সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ‘ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২০০১ সালের ১২ই জুলাই বাংলাদেশ সরকার ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেডকে ২৫ বছরের লাইসেন্স প্রদান করে টেলিফোন সংযোগ প্রদানের ব্যবসা করার। এরপর তারা টেলিফোন নেটওয়ার্কের কাজ শুরু করে। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন অ্যাক্ট অব ২০০১ প্রণয়ন এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) গঠন করা হয়। ২০০৪ সালের ২০শে এপ্রিল এই কমিশনের নির্দেশে ‘ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেড’র কাজকর্মে সীমাবদ্ধতা আসে। এ কারণে ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিং নিজেদের ‘ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেড’ থেকে গুটিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ অবস্থায় যুক্তরাজ্যস্থ ওয়ার্ল্ডটেল লিমিটেডের মূল অভিভাবক কোম্পানির কার্যক্রম যুক্তরাজ্যে নিষ্ক্রিয় করার পরিকল্পনা নেয়।
ফলে ওয়ার্ল্ড কমিউনিকেশন ইনভেস্টমেন্টস ইন করপোরেটেড নামক আরেকটি প্রতিষ্ঠান ঢাকায় ‘ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেড’ কর্তৃক ক্রয়কৃত যাবতীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনে নেয় বাংলাদেশে চলমান নেটওয়ার্কিং অব্যাহত রাখতে। উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ড কমিউনিকেশন ইনভেস্টমেন্টস ইন করপোরেটেডের মালিক নাঈম চৌধুরী এবং ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ লিমিটেডের ৯৯.৪৬% শেয়ার তিনি কিনে নেন। অবশিষ্ট ০.০৫৪% শেয়ার ক্রয় করে ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিং কোম্পানি। আর এই ০.০৫৪% শেয়ারের দৌড়ে পুরো কোম্পানি গ্রাস করার অভিলাষে ১/১১ পরবর্তী কেয়ারটেকার সরকারের দাপটে আমজাদ খান র্যাব দিয়ে নাঈম চৌধুরীকে অকথ্য নির্যাতন করেন। এ অভিযোগ করেছেন নাঈম চৌধুরী। তিনি বলেন, আমজাদ খানের মালিকানাধীন বাংলা ফোন রয়েছে ঢাকায় এবং তার বেশির ভাগ শেয়ার তার। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী একই ব্যক্তি একত্রে একাধিক টেলিফোন কোম্পানির লাইসেন্স বহন করতে পারেন না। উল্লেখ্য, ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন টড কিরনান। তিনিও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ২০০৭ সালে তিনি ওই কোম্পানি ত্যাগের আগে নাঈম চৌধুরীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলা করেন। সে মামলায় দাবি করা হয়, নাঈম চৌধুরীর কোন অধিকার নেই ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার। এছাড়া নাঈম চৌধুরী তার ঋণের আবেদনে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেন বলেও উল্লেখ করা হয় ওই মামলায়। এ মামলার আগেই বাংলাদেশ সরকারের পৃথক দু’টি সংস্থা ব্যাপক তদন্ত করে ওই সব অভিযোগের জবাবে জানায়, নাঈম চৌধুরী কোন জালিয়াতি করেননি এবং তিনি ওয়ার্ল্ডটেলের প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্য। ঢাকার চিফ মেট্রপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ওই তদন্ত রিপোর্ট নথিভুক্ত করেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আরেকবার তদন্ত করা হয়। তারাও ওই তদন্ত রিপোর্টের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।
২০০৬ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর নাঈম চৌধুরী এক বৈঠকে মিলিত হন ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিংয়ের সঙ্গে। বৈঠক হয় ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশের শেয়ারগুলো ওয়ার্ল্ড কমিউনিকেশন ইনভেস্টমেন্টস ইন করপোরেটেডের সঙ্গে একীভূত করা নিয়ে। ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিংয়ের শেয়ারগুলোও ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত করতে আমজাদ হোসেন খান মত দেন অর্থাৎ ওই বৈঠকের পর ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ হোল্ডিংয়ের আর কোন সম্পর্ক নেই নাইম চৌধুরীর মালিকানাধীন ওয়ার্ল্ড কমিউনিকেশন ইনভেস্টমেন্টস ইন করপোরেটেডের সঙ্গে। এ সময় নাঈম চৌধুরীর কাছ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার ডলার নেন বাংলাদেশ হোল্ডিংয়ের মালিক পক্ষ। এ সময় অবশ্য বাংলা ফোনের কোপার সার্ভিসে যাবতীয় সহায়তা দেবে ওয়ার্ল্ডটেল বাংলাদেশ- এ বিষয়টি বহাল থাকে। সব কিছু ঠিকঠাকই চলছিল। এমনি অবস্থায় ১/১১-তে গঠিত কেয়ারটেকার সরকারের জরুরি শাসন শুরুর পর আমজাদ হোসেন খান নিজের দাপট খাটিয়ে র্যাবকে প্রভাবিত করেন। এর বহির্প্রকাশ ঘটে এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও নাঈম চৌধুরীকে ধরে নিয়ে দীর্ঘদিন অকথ্য নির্যাতনের মাধ্যমে। মামলায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নাঈম চৌধুরীর কাছে অবৈধ সুবিধা নেয়ার অভিপ্রায়েই র্যাব দিয়ে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে এবং জেলেও রাখা হয়েছিল। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, র্যাবের একজন কর্মকর্তাও অকপটে স্বীকার করেছেন যে তারা আমজাদ হোসেন খানের অনুরোধেই নাঈম চৌধুরীকে নির্যাতন করেছেন। নাঈম চৌধুরী মাননীয় আদালতকে জানিয়েছেন, র্যাবের কথিত নির্যাতন সেলে তাকে কিভাবে কষ্ট দেয়া হয়েছে। অথচ যে অভিযোগে তাকে ধরে নেয়া হয় চোখ বেঁধে, সে অভিযোগের কোন ভিত্তি পায়নি সরকারের লোকজন- এটি আগেই প্রমাণিত হওয়ার পরও আমজাদ হোসেন খানের আবেদনকে কিভাবে র্যাব গ্রাহ্য করলো তা খতিয়ে দেখার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করছেন প্রবাসীরা। এছাড়া অর্থনৈতিক বিষয়ে র্যাবের আদৌ কোন কর্তৃত্ব রয়েছে কিনা সেটিও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। তা না হলে নিকট ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে এ ধরনের আরও অনেক মামলার উদ্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ মামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল কোর্টও জানলো যে র্যাব কিভাবে নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে র্যাব বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ইমেজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে- এখন প্রবাসীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে র্যাবের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্বকে হালকা করা হলো। নিজেদের এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও অন্যকে সন্তুষ্ট করার জন্য অন্যায়ভাবে প্রবাসীদের হেনস্থা করার ঘটনাটি নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারকরা কি ভাবছেন তা এখন দেখার পালা। মামলার বাদী নাঈম চৌধুরী বলেছেন, মাতৃভূমিতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হলো তা যেন আর কোন প্রবাসীর জীবনে নেমে না আসে। তবে আমি হাল ছাড়িনি। বাংলাদেশের আইন যদি ঠিকমতো কাজ না করে বিশ্বায়নের এ যুগে, তবে আমরা আন্তর্জাতিক আইনেও বিচার পেতে সক্ষম হবো।
এদিকে মামলার সর্বশেষ পরিস্থিতির ব্যাপারে জানতে চাইলে আমজাদ খানের এটর্নি এরিক চার্লটন ৫ই অক্টোবর বলেছেন, তারা জুরি ট্রায়ালের পর যে রায় দেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে আপিল করেছেন। তবে আপিলের শুনানির তারিখ এখনও ধার্য হয়নি।
Manab Zamin
07 October 2010
No comments:
Post a Comment