ফারুক তাহের, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দর পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গতকাল ফের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বন্দরের ১২ নম্বর বার্থ। বন্দরে নৌমন্ত্রীর আগমনের খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিকালে বন্দর চেয়ারম্যান আরইউ আহমেদ শ্রমিক নেতাদের নিয়ে বন্দরের ভিতরে প্রবেশ করে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বলেন। একপর্যায়ে তারা ১২ নম্বর বার্থ চালু করতে গেলে শত শত শ্রমিক বন্দরের সংরক্ষিত এলাকার ফটক ডিঙিয়ে নেতাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় বন্দরের কোনো কোনো কর্মকর্তা ও শ্রমিক নেতারা বন্দরের খালি কনটেইনার এবং শেডে আত্মগোপনও করেন। শেষে চারটি অ্যাম্বুলেন্সে করে শ্রমিক নেতা ও কর্মকর্তাদের উদ্ধার করে আনে নিরাপত্তাকর্মীরা। হামলায় শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান খান, শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল আহাদ, নওশাদ আলী ও সিদ্দিক আহত হন। শ্রমিক নেতাদের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিকাল ৫টার দিকে বন্দরের অন্যান্য বার্থেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বন্দর ও বন্দর ভবনের আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় একজন সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ শ্রমিক আহত হয়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতা মাহফুজুর রহমান খান। তবে অন্য সূত্রগুলো আহতের সংখ্যা আরো বেশি বলে দাবি করেছেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বন্দরের রেস্ট হাউসে পৃথক দফায় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও বার্থ অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ ছাড়াও নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালে (সিসিটি) বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছিল।
১২ নম্বর বার্থ অপারেটর শাহাদাত হোসেন সেলিম অভিযোগ করেন, সীমাহীন প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে এই অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বন্দরের শ্রম পদ্ধতিকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। এদিকে টানা পাঁচ দিন ১২ নম্বর বার্থ ও তিন দিন ধরে ১০ ও ১৩ নম্বর বার্থ এবং দুই দিন ধরে ১২টি বার্থের কোনোটিতে কাজে যোগ দেননি শ্রমিকরা। ফলে বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ ও কনটেইনার বার্থে কোনো পণ্য লোডিং-আনলোডিং হয়নি। এতে বন্দরের ভিতরে এবং বহির্নোঙরে জাহাজ জট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল পর্যন্ত পণ্য খালাসের জন্য বন্দরের ভিতরে এবং জেটিতে ৩৪টি জাহাজ ভিড়েছে। বহির্নোঙরে রয়েছে ৭৪টি জাহাজ। এদের মধ্যে ৩০টি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জানা গেছে, সোমবার গভীর রাত থেকে গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত ডক বন্দর শ্রমিক ফেডারেশন ও ডক শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বন্দর চেয়ারম্যান ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দফায় দফায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে শ্রমিক নেতারা কাজে যোগ দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করলেও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা তাদের দাবি না মানার আগে কোনোভাবেই কাজে যোগ দিতে রাজি হয়নি। বার্থ অপারেটরদের সমঝোতার ভিত্তিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিক নেতারা বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে শ্রমিকদের বোঝাতে চাইলেও তারা দিনভর বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে বন্দর এলাকায়। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসার আগে কাজে যোগ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। বন্দরের উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি আলাপের জন্য শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের আজ বিকাল ৫টায় ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। বৈঠকে বন্দর সমস্যার সন্তোষজনক সমাধান হবে বলে আশা করছেন সাধারণ শ্রমিকরা। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বসার আগে তারা বন্দরের বার্থ চালুর বিরোধিতা করেছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা।
এদিকে চিটাগাং চেম্বারের নেতৃত্বে গঠিত বন্দর কার্যক্রম মনিটরিং কমিটির ২য় সভায় চেম্বার নেতৃবৃন্দ বন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি তথা অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ খ্যাত বন্দরের এ লাগাতার অচলাবস্থার জন্য তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে চট্টগ্রাম চেম্বারের নেতারা বলেন, জাতীয় অর্থনীতির এ বিপুল ক্ষতির পিছনে কোনো অশুভ মহলের ষড়যন্ত্র বা অপতৎপরতা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে হবে। চেম্বার পরিচালক এসএম আবু তৈয়বের সভাপতিত্বে গতকাল অনুষ্ঠিত এ সভায় সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি সাতটি সুপারিশ করা হয়।
সভায় চেম্বার সহ-সভাপতি এসএম শফিউল হক, বিজিএমইএ'র এএম চৌধুরী (সেলিম), বিকেএমইএ'র শওকত ওসমান, বারভিডা'র মাহবুবুল হক চৌধুরী (বাবর), সিএন্ডএফ এজেন্টস্ অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু ও বন্দরবিষয়ক সম্পাদক লিয়াকত আলী হাওলাদার, শিপিং এজেন্টস প্রতিনিধি ও চেম্বার পরিচালক ওয়াসিউর রহমান চৌধুরী এবং সাবেক চেয়ারম্যান আহসানুল হক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
Bangladesh Pratidin
13.10.10
No comments:
Post a Comment