মো. মোস্তাফিজুর রহমান আমিন
প্রায় ৫ কোটি টাকা ঋণ রেখে পরিবার-পরিজন নিয়ে আচমকা উধাও হয়ে গেছেন ভৈরবের ৪ প্রতিষ্ঠিত চাল ব্যবসায়ী। তাদের পালিয়ে যাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন পাওনাদার ব্যবসায়ীরা। এদের মধ্যে যাদের পাওনার অংক যত বেশি, সমস্যায় পড়েছেন তারা তত। এরই মধ্যে ২-৩ জন ব্যবসা বন্ধ করে ঘরবাড়ি বিক্রি করে দেনা শোধ করতে হবে বলে জানিয়েছেন। উধাও হওয়া ওইসব ব্যবসায়ীর কাছে সাধারণ ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকারও ওপর। বাকি টাকা স্থানীয় বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, কো-অপারেটিভ ব্যাংক, এনজিওর। এর মধ্যে ২ লাখ থেকে ২০ লাখ পর্যন্ত টাকা পাবেন এমন ব্যবসায়ী আছেন ১০-১৫ জন। ৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার দাবিদার আছেন ২০-২৫ জন।
গত এক মাসের ব্যবধানে কাউকে না জানিয়ে ব্যবসা গুটিয়ে পালিয়ে যান তারা। তাদের নিজ বাড়ি ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে কোনো হদিস না পেয়ে হতাশ পাওনাদাররা। এ ঘটনা স্থানীয় চাল বাজারে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। উধাও হয়ে যাওয়া ওই ব্যবসায়ীরা হলেন ধ্রুব রাজ সাহা (প্রো. শুভ ট্রেডার্স), মো. আলমগীর হোসেন (প্রো. মেসার্স আলমগীর ট্রেডার্স), মো. মিজানুর রহমান (প্রো. বিসমিল্লাহ্ ট্রেডার্স) ও জুয়েল আহমেদ (প্রো. মেসার্স যোশেফ ট্রেডার্স)। চাল ব্যবসায়ী নেতাদের অভিমত, ক্ষুদ্র ঋণদাতা সংস্থা (কো-অপারেটিভ ব্যাংক) ও সুদখোর মহাজনদের উচ্চহারের ঋণ চাল ব্যবসায়ীদের ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে দেউলিয়া হয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যাচ্ছেন তারা। উচ্চসুদে ঋণপ্রদানকারী ওইসব অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠান এবং সুদখোর মহাজনকে প্রতিহত করতে না পারলে ওই চারজনের মতো আরও অনেকেরই এমনিভাবে উধাও হওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী নেতারা। আর এতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাণিজ্য নগরী ভৈরবের চাল ব্যবসাসহ সব ব্যবসা-বাণিজ্য।
এদিকে ভৈরবের চালের আড়তদাররা জানান, এ অঞ্চলের চাল ব্যবসা প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গত ১০ বছরে নতুন করে অনেক খুচরা বিক্রেতা ও প্রতিষ্ঠিত চালের আড়তদারের কর্মচারীরা রাতারাতি আড়ত খুলে ব্যবসায়ী বনে যান। ফলে চাল বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। প্রতিযোগিতায় টিকতে গিয়ে বাকিতে চাল বিক্রির প্রবণতা বৃদ্ধি পায় তাদের মধ্যে। এতে বৃদ্ধি পায় পুঁজির প্রয়োজনীয়তা। সেই সুযোগ গ্রহণ করে রাতারাতি গজিয়ে ওঠা ২০-২৫টি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান ও এনজিও এবং সুদখোর মহাজনরা। এদের কাছ থেকে দৈনিক কিস্তি এবং শতকরা প্রায় ৪২ টাকা হারে ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়েন ওইসব ব্যবসায়ী। একপর্যায়ে নিজের তহবিল নষ্ট হওয়ার পর বাজারের অন্যান্য চালের আড়তদারের কাছ থেকে বাকিতে চাল কিনে সেকেন্ড পার্টি হয়ে বিভিন্ন মোকামে বাকিতেই চাল বিক্রি শুরু করেন তারা। এভাবে একদিকে তাদের ঋণের পরিমাণ যেমন বাড়তে থাকে অন্যদিকে সুদের টাকা পরিশোধ করতে হয়ে পড়েন তারা দেউলিয়া।
ভৈরব খাদ্যশস্য বণিক সমিতির সভাপতি হাজী সিরাজ উদ্দিন জানান, উচ্চহারে সুদ দিতে গিয়ে ওই ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে পালিয়েছেন। সুদ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ না করা হলে ভৈরবের চাল ব্যবসাসহ সব ব্যবসায় ব্যাপক ক্ষতি হবে। তিনি অবিলম্বে ওইসব অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে যথাযথ তদন্তসাপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
মাতৃভূমি কমার্স অ্যান্ড ফাইনান্স লিমিটেড ভৈরব শাখার পরিচালক পংকজ কুমার ওই পলাতক চাল ব্যবসায়ীদের দু’জনের কাছে তার প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪ লাখ টাকা পাওনা থাকার কথা স্বীকার করলেও, কো-অপারেটিভ ব্যাংকের সুদের কারণে ভৈরবের ব্যবসা নষ্ট হচ্ছে—এ কথা তিনি অস্বীকার করেন।
Amardesh:23 September 2010
No comments:
Post a Comment