সাইফ ইসলাম দিলাল
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেলপথে ঢাকায় কনটেইনার পরিবহনে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ব্যবসায়ীরা ভয়াবহ সঙ্কটে পড়েছেন। বিদেশ থেকে আনা কনটেইনার ঘুষ ছাড়া রেলপথে ঢাকায় আনতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে যারা ঘুষ দেন না তাদের কনটেইনার এক থেকে দেড় মাস পর্যন্ত বন্দরে পড়ে থাকে। জানা যায়, বন্দর ও রেলওয়ের একশ্রেণীর কর্মকর্তা প্রতি কনটেইনারে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে ধারাবাহিকতা ভেঙে রেলপথে কনটেইনার পাঠাচ্ছে।
জানা গেছে, বন্দরে একশ্রেণীর দালাল আছে যারা সিরিয়াল ভেঙে রেলপথে কনটেইনার আনার ব্যবস্থা করে থাকে। তারা পণ্যের গুরুত্ব বুঝে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করে থাকে। ঘুষের এ অর্থ তিন-চারজনের মধ্যে ভাগ হয়। দালাল, বন্দর এবং রেলওয়ের কর্মকর্তারা এ অর্থের ভাগ পেয়ে থাকেন। এ পদ্ধতি ছাড়াও সরাসরি কনটেইনার পরিবহনে অনিয়ম হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় কিংবা বন্দর কর্তৃপক্ষ অগ্রাধিকারের কথা বলে দ্রুত কনটেইনার পরিবহনের ব্যবস্থা করে থাকে। ব্যবসায়ীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সিরিয়াল ভেঙে দ্রুত পরিবহনের ব্যবস্থা নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। জানা যায়, জরুরি ভিত্তির কথা বলা হলেও এখানেও সেই ঘুুষ বাণিজ্য মূল চালিকাশক্তি।
এ ব্যাপারে বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কনটেইনার পরিবহনে রেলওয়ের এ সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। জরুরি ভিত্তিতে এ সঙ্কটের সমাধান না হলে সামনে আরও বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে।
সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড থেকে যেখানে কনটেইনার আসতে সময় লাগে মাত্র ৫ থেকে ১৫ দিন, সেখানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রেলপথে ঢাকার কমলাপুর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোতে (আইসিডি) আসতে এক থেকে দেড় মাসের বেশি সময় লাগছে। তাই ঢাকা ও আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচ দিয়ে রেলপথের পরিবর্তে সড়কপথে পণ্য পরিবহনে বাধ্য হচ্ছেন।
এর ফলে আমদানিকৃত ও রফতানিমুখী পণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রফতানিমুখী পণ্য পরিবহনে রেলপথের চেয়ে সড়কপথে ব্যয় ৩০০ শতাংশ বেশি। আমদানিকৃত পণ্যের ক্ষেত্রে সড়কপথের চেয়ে রেলপথে ব্যয় ২০০ শতাংশ বেশি।
প্রসঙ্গত, আমদানি-রফতানি পণ্যভর্তি কনটেইনারের মাত্র ৩০ শতাংশ চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকার। বাকি ৭০ শতাংশ কনটেইনার ঢাকামুখী। এসব পণ্যের সিংহভাগই সড়কপথে পরিবহন করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার পরিবহন বাড়লেও দুর্নীতি ও নানা জটিলতার কারণে রেলপথে ঢাকার আইসিডিমুখী কনটেইনার পরিবহন কমছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বন্দরে কনটেইনার পরিবহন বেড়েছে ৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। অথচ একই সময়ে কমলাপুর আইসিডিতে পণ্য পরিবহন কমেছে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ সময়ে কনটেইনার পরিবহন হয় ৬৫ হাজার ৮৬৭ ইউনিট।
প্রসঙ্গত, ঢাকা-চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ১৫ টন ওজনের একটি কনটেইনার পণ্য পরিবহনে সড়কপথে খরচ পড়ে ন্যূনতম ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে রেলওয়ের ভাড়ার হার অনুযায়ী আমদানিকৃত পণ্যবাহী ১৫ টন ওজনের ২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডিতে পরিবহনে লাগে ছয় হাজার টাকা। রফতানিমুখী পণ্যবাহী কনটেইনারে এ খরচ তিন হাজার টাকা।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানান, বন্দরে কনটেইনার পরিবহন যে হারে বাড়ছে, রেলওয়েতে ঢাকার আইসিডিমুখী কনটেইনার পরিবহনে সেই হার ধরে রাখা যায়নি। এজন্য বন্দর ও আইসিডি অংশে কনটেইনার ওঠানামার যন্ত্রপাতির স্বল্পতা, রেলওয়ে ইঞ্জিন ও চালক সঙ্কট মূল কারণ ।
কমলাপুর আইসিডি পরিচালনা করছে বেসরকারি সংস্থা গ্যাটকো। এ সংস্থার যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে পণ্য ওঠা-নামায় সময় বেশি লাগছে।
প্রসঙ্গত, ৩০ ওয়াগনের একটি ট্রেনে ৬০ ইউনিট কনটেইনার বোঝাই, পরিবহন ও খালাস করতে সময় লাগছে ৫৫ থেকে ৫৯ ঘণ্টা। অথচ এক বছর আগেও এই সময় লাগত ৩৬ থেকে ৩৭ ঘণ্টা। ধারাবাহিকভাবে পণ্য পরিবহন করতে না পারায় এভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে ঢাকার আইসিডিমুখী কনটেইনারের জট তৈরি হচ্ছে।
বছরে ৮০ হাজার ইউনিট কনটেইনার ওঠানামার ক্ষমতাসম্পন্ন এ সরকারি আইসিডি চালু হয় ১৯৮৭ সালে। বন্দর থেকে রেলপথে ৩২০ কিলোমিটার দূরত্বের এই আইসিডিতে নিয়ে আমদানি পণ্য খালাস এবং রফতানি পণ্য বোঝাইয়ের সুবিধার জন্য এটি চালু করা হয়েছিল। চালু করার পর গত জুন পর্যন্ত আইসিডিতে নয় লাখ ৩৬ হাজার ৪৪৯ ইউনিট কনটেইনার পরিবহন হয়।
Amardesh: 01 Sep 2010
No comments:
Post a Comment